‘ব্রেথ’ : প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রাণভরে বাঁচতে শেখায়  »  সাম্প্রতিক ভাবনা » ম্যাজিক লণ্ঠন

সাম্প্রতিক ভাবনা

‘ব্রেথ’ : প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রাণভরে বাঁচতে শেখায়

তামান্না মৌসী | মার্চ, ২০১৮

গল্পটা রবিন আর ডায়ানার। ৬০ দশকের শেষভাগে টগবগে যুবক রবিন প্রেমে পড়ে সুন্দরী ডায়ানার। শখের বশে পাইলট হওয়া রবিন আবার ক্রিকেট, টেনিসেও সমান পারদর্শী। কাজেই ডায়ানার মন পেতে দেরি হয় না তার। বাবা- ভাইয়ের মৃদু আপত্তি থাকার পরও বিয়েটাও দ্রুত সেরে ফেলেন তারা। তবে রোম্যান্টিক কমেডির মতো- অতঃপর তাহাদের সুখে শান্তিতে সংসার করা আর হয়ে ওঠে না।

পেশায় টি ব্রোকার (বিভিন্ন দেশ থেকে ভালো জাতের চা পাতা বাছাইয়ের কাজ করেন যিনি) রবিন নববধূকে নিয়ে ব্যবসার কাজে কেনিয়া যান। আর সেখানেই তিনি জানতে পারেন স্ত্রীর প্রেগনেন্সির কথা। অবশ্য তাতে উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো পর্যাপ্ত সময় মেলে না রবিনের। কদিন পরেই হঠাৎ এক জটিল রোগ ধরা পরে তার শরীরে। ফুসফুস এবং শ্বাসনালীর সমস্যার কারণে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস- প্রশ্বাস চালাতে অপারগ হয়ে পড়েন রবিন। গলায় নল লাগিয়ে কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেওয়ার ব্যাবস্থা করতে গিয়ে হাসপাতালেই শয্যাশায়ী থাকতে হয় তাকে। সেখানে শুয়ে থেকেই দেখতে হয় নবজাতক সন্তানের মুখ। কিছুদিন পর অবশ্য তাকে ইংল্যান্ডে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানকার চিকিৎসকরাও সারিয়ে তুলতে পারেন না রবিনকে। একপর্যায়ে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের কথাও ভাবেন বিছানাবন্দি রবিন। কিন্তু নাছোড়বান্দা ডায়ানা তাকে ছেড়ে যেতে রাজি তো হনই না, উলটো ছেলের বেড়ে ওঠা দেখার জন্য রবিনকেই বেঁচে থাকতে রাজি করেন। এরপর স্বামীকে হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে শহরের বাইরের এক নিরিবিলি বাড়িতে নিয়ে তোলেন ডায়ানা। দেখাশোনার যাতে সমস্যা না হয় সেজন্য নার্সের কাজগুলো নিজেই শিখে নেন তিনি। আর রবিন তার মেকানিক বন্ধুর সহায়তায় ভ্রাম্যমাণ শ্বাসযন্ত্রসহ একটা হুইল চেয়ারও বানিয়ে ফেলেন। এভাবে শারীরিক অক্ষমতার কারণে বন্দিদশা থেকে অনেকটাই মুক্তি পান তিনি। ১৯৭৩ সালে এক স্প্যানিশ চিকিৎসকের আগ্রহে বাণিজ্যিকভাবে এ চেয়ার বানানোর উদ্যোগ নেন এ দম্পতি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সে পরিকল্পনা সার্থকও হয় তাদের।  

তবে সবকিছুই যখন স্বাভাবিক হয়ে আসছিলো- তখনই দেখা দেয় নতুন আরেক বিপত্তি। ১৯৮১ সালের দিকে রবিনের কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র প্রায়ই অকেজো হয়ে পড়ে। আর যন্ত্র কাজ না করলে গলার ছিদ্র দিয়ে চলে অনবরত রক্তপাত। পরিস্থিতি ক্রমশ ভয়াবহ হতে থাকলে রবিন স্বেচ্ছ্বামৃত্যুর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রথমদিকে সবাই আপত্তি তুললেও তার যুক্তির কাছে হার মানে সবাই। কারণ ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকাটাই যে জীবন নয়, সেটা তো রবিনই শিখিয়েছে আমাদের। তিলে তিলে মরার চেয়ে একটা সময় মৃত্যুকে মেনে নেওয়াটা বুদ্ধিমানেরই কাজ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে প্রায় ৩০ বছর বাঁচার পর রবিনের স্বেচ্ছামৃত্যু তাই আমাদের উজ্জীবিতই করে।

সত্যঘটনা অবলম্বনে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত ব্রেথ (Breathe) চলচ্চিত্রের কাহিনির মতোই দুর্দান্ত কলাকুশলীদের অভিনয়। অভিনয়শিল্পী ক্লেয়ার ফোয়ে ডায়ানার চরিত্রটিকে একজন দৃঢ়চেতা নারী হিসেবেই তুলে ধরতে পেরেছেন। আর রবিন চরিত্রে অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের অভিনয় এককথায় অনবদ্য। শুধু মুখের অভিব্যাক্তি দিয়েই একজন অসুস্থ মানুষকে তিনি সার্থকভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। রবিনের কথা বলার অপারগতা তিনি পুষিয়ে দিয়েছেন কখনও ভুরু নাচিয়ে, কখনও নাক কুচকে। আবার কখনওবা শুধুই মুখ বাকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গি করে। চলচ্চিত্রটির সিনেমাটোগ্রাফিও অসাধারণ। ২০১৭ সালে বসে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের দৃশ্যায়নে প্রযুক্তিকে ভালোভাবেই কাজে লাগিয়েছেন চিত্রগ্রাহক রবার্ট রিচার্ডসন। গাড়ি চালানো কিংবা বিমান ওড়ার সময় ওয়াইড অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া শটগুলো যেনো রবিনের হৃদয়ের শূন্যতারই প্রতীক। চলচ্চিত্রটি দেখতে গিয়ে কখনো যেনো রবিনের দুঃখ-কষ্ট-শূন্যতা নিজের অজান্তেই মনকে ভারি করে তোলে। একঘণ্টা ৫৮ মিনিটের এ চলচ্চিত্রটি জীবনকে নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু হলেও বদলে দিবে।

আইএমডিবি রেটিং ৭.১ দেখেও যদি চলচ্চিত্রটির প্রতি আগ্রহ না জন্মায়, তাহলে পরিচালকের নামটা হয়তো আপনাকে আগ্রহী করবে। গুণী অভিনয়শিল্পী অ্যান্ডি সার্কিসের পরিচালক হিসেবে অভিষেক ঘটলো এ চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই। লর্ড অব দ্য রিংস, দ্য হবিট, স্টার ওয়ার্স- এর মতো নামীদামী সব ফিল্ম সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। চমক কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্রযোজক হিসেবে জোনাথন ক্যাভেন্ডিশেরও প্রথম চলচ্চিত্র এটি। জ্বি, ঠিকই ধরেছেন ইনিই গল্পের নায়ক রবিন ক্যাভেন্ডিশের একমাত্র সন্তান।

লেখক : তামান্না মৌসী, সাবেক সংবাদকর্মী। বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্সিং করছেন।
tammcj@gmail.com
 


Powered By Dhaka Web Host

Jobsmag.inIndian Education BlogThingsGuide