সাম্প্রতিক ভাবনা

‘মহুয়া সুন্দরী’ : নির্মাতার অদক্ষতায় শিব গড়তে বানর

ইব্রাহীম খলিল | জুন, ২০১৭

মনটা বেশ খারাপ। ঘণ্টা চারেক আগেও যেটা ভালো ছিলো সেটা আস্তে আস্তে চরম খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন রাত তিনটার দিকে যেভাবে আগ্রহভরে ঘুমতে যাই সেটা কেনো জানি চুপসে গেছে। সঙ্গে অস্বস্তি তো আছেই। এই মন খারাপ আর অস্বস্তির কারণ আশাভঙ্গ। তাই সাধের আশাভঙ্গের কারণে আমি অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ, মর্মাহত এবং একই সঙ্গে বিরক্তও বটে।

বিরক্ত না করে আসল কথায় আসি। গত ২০ নভেম্বর বাংলাদেশে বেশ ঘটা করে মুক্তি পেলো রওশন আরা নিপা পরিচালিত মহুয়া সুন্দরী। ময়মনসিং গীতিকার অন্তর্ভূক্ত কবি দ্বিজ কানাই-এর প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে লেখা ঠিক একই নামে একটি পালার কথা জানা থাকায় চলচ্চিত্রটি দেখতে মনটি বেশ আনচান করছিলো। যখন জানতে পারলাম এটা আবার সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্র তখন তো রীতিমত মনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হলো—কখন দেখবো! এতো কর্তাব্যক্তিরা যেখানে নজরদারিতে আছেন সেখানে নিজেদের ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছু হলেও তো জানতে পারবো। অবশেষে ব্যস্ততা রেখে সোমবার (২৩ নভেম্বর) রাত নয়টার শো দেখার জন্য রাজশাহীর উপহার সিনেমা হলে উপস্থিত হলাম। সেখানে পৌঁছাতেই ছয়টার শো দেখা দর্শক দেখে মনে খটকা লাগলো। এমন নামে একটা চলচ্চিত্র মুক্তি পেলো অথচ তিনদিন অতিবাহিত করলেও দর্শকের কোনো আনাগোনাই নাই! তাহলে কী রাজশাহীর মানুষ নিজেদের লোক সংস্কৃতির কদর জানে না? নাকি হরতালে বাইরে বের হবে না বলে পণ করেছেন?

যাহোক অবশেষে মনের আশঙ্কা দূর করে সময় মতো প্রেক্ষাগৃহে প্রবেশ করি। নিচে উপরে সব মিলিয়ে দশর্কের সংখ্যা সর্বোচ্চ জনা পঞ্চাশের মতো হবে। চলচ্চিত্র যখন আস্তে আস্তে শুরু হলো তখন মনে মনে ৩০০ বছর আগে নিজের লোক সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার উত্তেজনা আরো বাড়তে থাকলো। কিন্তু গল্প যখন আরেকটু এগিয়ে গেলো, তখন ধপ করে মনের আশাটাই মরে গেলো। চলচ্চিত্রের কাহিনি উল্লেখ করে লেখা আর দীর্ঘায়িত করছি না। তবে শেষ পর্যন্ত দেখে যা মনে হয়, নির্মাতা নিপা ‘মহুয়া সুন্দরী’ যে একটা বিখ্যাত পালা তিনি হয়তো সেটা জানেনই না। আর সেটা যদি কোনোভাবে ‘ক্লাসের নোট’ থেকে জেনেও থাকেন তাহলে বলতে হবে তিনি কখনো কোনোদিন কোনো পালা কিংবা যাত্রাই দেখেননি। কারণ ছবিরাণী (পরীমনি) কিংবা জোসনা (সুচরিতা) মাসিদের মঞ্চে যে উচ্চারণশৈলী সেটা মঞ্চনাটকের সঙ্গে গেলেও পালার সঙ্গে কখনোই যায় না। মনে রাখা প্রয়োজন, পালার অভিনয়শিল্পীদের জন্য মঞ্চে মাইকের ব্যবস্থা না থাকায় চিৎকার করে কথা বলতে হতো। কারণ তাদের প্রত্যেকটি ডায়লগ শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকের কাছেও পৌঁছানো চাই। কিন্তু সেই ভঙ্গি এখানে অনুপস্থিত।

অন্যদিকে চলচ্চিত্র শুরুর দিকে ছবিরাণী মঞ্চে গানে গানে যেভাবে নৃত্য করেন সেটা ঠিক কোনো বার নাকি পালা মঞ্চ তা স্পষ্ট নয়। আবার যাত্রার দল একই গ্রামে অবস্থান করলেও সেট ও লোকেশন বার বার পরিবর্তন করে নির্মাতা নিজেকে ফাঁকি দিলেও দর্শক হিসেবে সেটা বিরক্তিকর বলেই মনে হয়। কারণ তারা যেখানে অবস্থান করেন সেটাকে দেখে মনে হয় কখনো স্কুলের মাঠ, কখনো অবকাশ কেন্দ্র আবার কখনো বিনোদন পার্ক। আর একই গান কিংবা মঞ্চে গতানুগতিক চলচ্চিত্রের মতো বারবার পোশাক পরিবর্তন পালার বাস্তবতার সঙ্গে যায় কিনা সেটা নির্মাতার ভেবে দেখা জরুরি।

শরীরের দামে যেভাবে পালার অভিনয়শিল্পীরা তাদের জীবন নির্বাহ করেন সেটাও মনে হয় নির্মাতা কখনো হৃদয়ঙ্গম করেননি। তাদের অভিব্যক্তি আর হতাশা যেভাবে ঘিরে থাকে এখানে অনেকটাই মেকি মনে হয়। আবার একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় চলচ্চিত্রে প্রায় সকলেই সদ্য ভাঁজ খোলা নতুন ছাড়া পুরাতন পোষাক পরেননি। এখানে সবাই সবসময় মেকআপের মাধ্যমে ছিলো সতেজ। যেনো কারো কোনো দুঃখ নেই, হতাশাও নেই। সবাই কেবল পুরুষ ভুলিয়ে অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত। কিন্তু যাত্রা কিংবা পালার অভিনয়শিল্পীদের সম্পর্কে একটু খোঁজ নিলেই পাওয়া যায়, তারা মঞ্চের বাইরে কখনোই মেকআপ করতেন না, মুখে লিপস্টিকও দিতেন না। তারা কেবলই এটাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। আর চলচ্চিত্রের শেষে এসে নির্মাতা যেভাবে একটি কাঠের ছুরি দিয়ে ছবিরাণীকে আত্মহত্যা করালেন সেটা অনেকটা হাস্যকর মনে হয়। যেখানে স্পষ্টতই বোঝা যায় এটা কাঠের ছুরি সেখানে এটার কেনো এমন ব্যবহার সেটা স্পষ্ট নয়। বরং ডিজিটাল প্রজেকশন ও দর্শকের সম্পর্কে তিনি যে অকিবহাল নন সেটাই প্রমাণ পায়। আর কাহিনির দ্বৈত সত্তা কিংবা অসংলগ্নতা না-ইবা বললাম।

ডিজিটাল প্রজেকশন ও দর্শকের কথা এ কারণেই বলালম যে, দর্শকই হলো চলচ্চিত্রশিল্পের প্রাণ। তাই চলচ্চিত্রে নায়ক জীবন (সুমিত) যখন ছবিরাণীকে খোঁজার জন্য হন্যে হয়ে ঘোরে তখন এক দশর্ককে চেঁচিয়ে বলতে শোনা যায়, ‘শালার বেটা একটু আগে  মোবাইলে কথা বইললি এখন কল না করি রাস্তায় রাস্তায় খুঁইচিস কেঁনে?’ আসলে নির্মাতা হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন জীবন ঢাকা যাবার আগে ছবিরাণীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছিলেন। কিন্তু দর্শক সেটা ভোলেননি। তাই বিভিন্ন ত্রুটির কারণে শো চলার সময় দর্শক যখন নির্মাতা কিংবা অনুদান দেওয়ার জন্য কতৃপক্ষকে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলেন তখন বারবার মনে প্রশ্ন জাগে, এই লজ্জা/দায়ভার কার?

নতুন নির্মাতা হিসেবে নিপা হয়তো আরেকটু চেষ্টা করলে ভালো কিছুই করতে পারতেন। তিনি যে ‘মহুয়া সুন্দরী’ পালার নাম বেছে নিয়েছিলেন সেটা হয়তো বেদের মেয়ে জোসনা মতো আরেকটি রেকর্ডও গড়তে পারতো। চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ যখন তিনি করেছেন সেটা যে একদিন করবেনও সে আশা আমরা বাঁধতেই পারি। কিন্তু মহুয়া সুন্দরীর দুর্বল চিত্রনাট্য এবং পরিচালকের অদক্ষতা শেষ পর্যন্ত ‘শিব গড়তে’ গিয়ে সেটাকে বানরে রূপ দিয়ে ফেলেছেন এটাও মানতে হবে। তাই মনে হয়, এভাবেই হয়তো কতিপয় মানুষের ইয়ার্কি ইয়ার্কি খেলায় দর্শক তার স্বপ্ন/আশা হারায়। ফলে এতো হারানোর ভয়ে যতোদিন যায় হলে দর্শকের সংখ্যা কেবলই শূন্যের দিকে ধাবিত হয়।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
ibrahimrumcj@gmail.com



 


Powered By Dhaka Web Host

Jobsmag.inIndian Education BlogThingsGuide