সাম্প্রতিক ভাবনা

ঘেটুপুত্র কমলা, একজন হুমায়ূন ও একটি সিনেমার মৃত্যু

কাজী মামুন হায়দার | নভেম্বর, ২০১৫

বিষয়টি নিয়ে কথা বলা জরুরি নানা কারণে। ভাবছিলাম, কষ্ট পাচ্ছিলাম কিন্তু প্রকাশের কোনো মাধ্যম পাচ্ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত তাই এই কলম ধরা। যদি বলেন, অনেকটা অথর্ব মানুষের চিৎকার চেঁচামেচির মতো। কিন্তু তারপরও কেনো জানি বলতে ইচ্ছে করে। অনেক কথাইতো হচ্ছে, অনেকেই বলছেন। যাদের বলার প্রয়োজন নেই তারাও বলছেন, আবার অনেকের বলার প্রয়োজন আছে তারা বলছেন না। আরেক পক্ষ আছে, যাদের বলার এবং করার দুটোরই সামর্থ্য আছে। তাদের অনেকেই বলছেন, কিন্তু করছেন না; আবার অনেকে যা বলছেন সে-মতো কাজ করছেন না। অতিকথন মনে হতে পারে তারপরও বলছি। হুমায়ূন আহমেদ কী ছিলেন, কে ছিলেন—তা জানানো কিংবা তা মূল্যায়ন খুব জরুরি নয়। কারণ সেটা সময় বলে দেবে, হুমায়ূনের টিকে থাকা, না-থাকা। কিন্তু একথা ঠিক হুমায়ূন এখনও আমাদের মাঝে আছেন, মানে তার কাজগুলো এখনও আমাদের ভাবাচ্ছে। সেই শুরু নন্দিত নরক দিয়ে আর শেষটা দৃশ্যত ঘেটুপুত্র কমলায়। কিন্তু ঘেটুপুত্র কমলার হুমায়ূনকে আর মানুষ কাছে পেল না। অনেকে বলবেন কী বলেন? টেলিভিশনে দেখালাম, ড্রয়িং রুমে বসে দেখলেন আর বলছেন কাছে পেলেন না। কথার শুরু সেখান থেকেই।

বিজ্ঞাপনের-হাটে তিন মিনিটের সিনেমা দর্শনের পর ৩০ মিনিট অন্য চ্যানেল ঘুরে মানুষ দেখলো হুমায়ূনের ঘেটুপুত্রকে। আবার কেউ কেউ দেখলই না। দেখা না দেখা থাকতেই পারে, প্রশ্ন সেটি নিয়ে নয়। প্রশ্ন অন্যখানে, টেলিভিশনে কেনো ঘেটুপুত্র? জীবিত অবস্থাতেই বেশ ঘটা করে সিনেমাটির প্রিমিয়ার করেছিলেন হুমায়ূন। সাধারণ পাঠক সংবাদপত্রে খবর পড়ে, টেলিভিশনে দেখে জানতে পারে ঘেটুপুত্র সম্পর্কে, আগ্রহী হয়; ভাবে নিশ্চয় দেখবো। অপেক্ষা চলে, এর মধ্যে বড় ঘটনা হুমায়ূনের চলে যাওয়া—এরপরে দুই মাসের ব্যবধানে ঘেটুপুত্রকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু কোথায় সেই মুক্তি? উত্তর ঢাকার দু-তিনটি প্রেক্ষাগৃহে। এতেই শেষ, তারপর আবার অপেক্ষা ঘেটুপুত্র নিয়ে।

ঢাকায় ঘেটুপুত্র দেখার পর দর্শক প্রতিক্রিয়া নিয়ে সংবাদপত্রে খবর উঠে, টিভিতে মানুষের অশ্রুপাত দেখা যায়, ইন্টারনেটে গান পাওয়া যায় ‘শুয়া উড়িলো উড়িলো...’; আর মানুষ আগ্রহী হয় ঘেটুপুত্রকে দেখার জন্য। তারপর একদিন খবর আসে ঘেটুপুত্রকে টেলিভিশনে দেখানো হবে। আমি জানি না ‘মধ্যবিত্ত দর্শক’ এতে খুশি হয়েছিলেন কিনা? কিন্তু আমি খুশি হওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। আমার মন খারাপ হয়েছে, কষ্ট হয়েছে। কষ্ট হয়েছে হুমায়ূনকে নিয়ে, কষ্ট হয়ে মৃতপ্রায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে নিয়ে। অবাক হয়েছি তাদের কথা ভেবে যারা মুখে বাংলাদেশের সিনেমার উন্নতির জন্য প্রাণপাতের কথা বলেন, অথচ এমন সিদ্ধান্ত নেন।

টেলিভিশন চ্যানেল প্রযোজিত সিনেমা, টেলিভিশনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার নিয়ে অনেক কথা দীর্ঘ দিন ধরেই চলছে। অনেকে কর্ণপাত করছেন, আবার অনেকে হাতি-ঘোড়া মেরে সাবাড় করছেন—এমন ভেবে কানেই তুলছেন না। মাঝখানে যেটা হচ্ছে তাতে মৃতপ্রায় ইন্ডাস্ট্রির মৃত্যু আরও নিশ্চিত হচ্ছে। দেখুন দু-একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হবে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম, আশির্বাদ চলচ্চিত্র ও ভারতের একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে নির্মিত হয়েছিল গৌতম ঘোষের মনের মানুষ। খুবই ভালো কথা যৌথ প্রযোজনায় গৌতম ঘোষের মতো নামী পরিচালক দিয়ে অনেকদিন পর বাংলাদেশে সিনেমা হলো। আমরা আশায় বুক বাধলাম। সিনেমা তৈরি হলো; গৌতম, ইমপ্রেস ঘটা করে তিনবার বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের জন্য প্রিমিয়ার করলো।

এরপর ইমপ্রেস তার ‘বাহিনী’ নিয়ে সারা দেশ জুড়ে মনের মানুষ-এর প্রচার চালালো। সিনেমাটি মান নিয়ে কথা থাকতে পারে, কিন্তু তারপরও সবকিছুর উর্ব্ধে উঠে মানুষ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমাটি দেখলো। প্রায় সারা বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দর্শক দেখলো মনের মানুষ, শুনলো গান। একই ঘটনা ঘটলো পশ্চিম বাংলাতেও। এর কয়েক মাস পর মনের মানুষ দেখানো হলো টেলিভিশনে। সেই সাধারণ কৌশলের আওতায়—‘ব্যবসা’ হয়ে যাওয়ার টেলিভিশনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার করা। অনেকটা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো, অবশ্য এতে দোষেরও কিছু নেই। কারণ সিনেমা একই সঙ্গে যেমন শিল্প, আবার ইন্ডাস্ট্রিও—একথা অস্বীকার করার কিছুই নেই।

একইভাবে ইমপ্রেস বিশাল বাজেটের আরেকটি সিনেমা করলো স্বপন চৌধুরী পরিচালিত লালটিপ। এই সিনেমাটির প্রচারে তারা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে লালটিপ বিতরণ করলো। প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় লালটিপ নিয়ে চললো প্রচার, অনেকক্ষেত্রে সেটাকে প্রচারণা (propaganda) বললে একেবারে ভুল বলা হবে না। অবশ্য দ্বিতীয় বিষয়টি প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমাটি দেখার পর অনুভব করেছিলাম। এখন অবশ্য লালটিপ দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহেও মুক্তি পাচ্ছে। এটা খুবই ভালো কথা, আশার কথা; আমাদের সিনেমা বহির্বিশ্বও দেখছে। আমার কথা মূলত এটা নিয়ে নয়। আমি এই দুটি বিষয়ের সঙ্গে হুমায়ূনের ঘেটুপুত্র কমলার একটু তুলনা করতে চাই।

হুমায়ূনতো সিনেমা করে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেলেন। কয়েক মাস পর ফিরে এসে প্রিমিয়ার করলেন। তারপর আবার ফিরে গেলেন। কিন্তু সেই চলে যাওয়ার পর সবাইকে কাঁদিয়ে তিনি আর ফিরলেন না। এরপরের খবর সবার জানা চারদিকে যখন হুমায়ূন-হুমায়ূন রব, ঠিক সেই সময় ৭ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হলো ঘেটুপুত্র কমলা। ঠিক বোঝা গেল না, সারা দেশে মুক্তি না দিয়ে কেবল ঢাকার কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে তা দেখানো হলো। এমনিতেই হুমায়ূন, তার ওপর সিনেমাটির বিষয় বৈচিত্র এবং তার মৃত্যু সব মিলিয়ে যেটা বোঝা যাচ্ছিল সিনেমাটিকে দর্শক খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে। ঢাকার বাইরে যারা ছিলো, তারা ভাবতে থাকলাম এই বুঝি আমাদের পাশের প্রেক্ষাগৃহে ঘেটুপুত্র দেখতে পাবো। ঠিক এই রকম একটা মুহূর্তে ৯ অক্টোবর সংবাদপত্র মারফত জানা গেলো কোরবানির ঈদে একটি চ্যানেলে ঘেটুপুত্র দেখানো হবে! আর চ্যানেলে দেখানো মানেই বুঝতে পারছেন সেই বিড়ম্বনা। অন্যদিকে সিনেমাটি দেখানোর পরদিন থেকেই বাজারে পাওয়া যাবে এর পাইরেসি সিডি-ডিভিডি। তার মানে প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশে দেখার বিপরীতে আবার সেই ২০ ইঞ্চি টেলিভিশন কিংবা ১৮ ইঞ্চি কম্পিউটার মনিটরে দেখা। সিনেমা হিসেবে ঘেটুপুত্র কমলার যে মূল্যায়ন সেটি শুধু প্রদর্শন-মাধ্যমের পরিবর্তনেই অনেকখানি কমে যাওয়া।

সবচেয়ে বড় যে প্রশ্ন, চলচ্চিত্র সঙ্কটের এই মুহূর্তে সম্ভাবনাময় এমন একটি সিনেমাকে সারা দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না দিয়ে টিভিতে দেখানোর সিদ্ধান্ত কেনো তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান নিলো বিষয়টি পরিষ্কার নয়। অনেকে বললেন হঠাৎ বৃষ্টি তো টেলিভিশনে দেখানোর পরও ব্যবসা করেছিল, তাহলে ঘেটুপুত্র কেনো করবে না? তাদের জন্য বলি একথা ভুলে গেলে চলবে না, তথ্যপ্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়ে গেছে; এখন ঘরে ঘরে ডিভিডি-কম্পিউটার-ইন্টারনেট। আর গত এক যুগে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে সিনেমা দেখার সংস্কৃতিও আমাদের অনেকখানিই বদলে গেছে। তাই টেলিভিশনে সিনেমা দেখিয়ে পরে প্রেক্ষাগৃহে ব্যবসা করবে—এমন ভাবা একেবারেই অবান্তর। 
  
আলোচনা শেষ করছি ১৯৭৯ মুক্তি পাওয়া সূর্য দীঘল বাড়ি চলচ্চিত্রটির দুর্ভাগ্যের গল্প দিয়ে। মসিহ্উদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত এই সিনেমাটি বাংলাদেশের প্রথম সরকারি অনুদানের ছবি। স্বাধীনতার পর এই সিনেমাটি বাংলাদেশের জন্য প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতি বয়ে এনেছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় সেই সময় সিনেমাটি বাংলাদেশের মানুষ প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখতে পারেনি। প্রদর্শক-পরিবেশকদের ষড়যন্ত্রে আন্তর্জাতিকমানের এই সিনেমাটি কেবল নাটোরের একটি প্রেক্ষাগৃহে কয়েকদিন চালানোর পর নামিয়ে দেয়া হয়েছিল। এক অর্থে এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে মৃত্যু হয়েছিল সূর্য দীঘল বাড়ির।

আজ অনেক দিন পর ঘেটুপুত্র কমলার এমন পরিণতি দেখে বারবার কেনো জানি সূর্য দীঘল বাড়ির কথা মনে পড়ছে। কারণ বাংলাদেশ থেকে এবার ৮৫তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে বিদেশী ভাষার ছবির বিভাগে পাঠানো হয়েছে সিনেমাটিকে। আবার সংবাদপত্র পড়ে জানলাম ৭০তম গোল্ডেন গ্লোবস অ্যাওয়ার্ডেও সেরা বিদেশি ভাষার ছবির বিভাগে প্রতিযোগিতা করছে ঘেটুপুত্র কমলা। জানি না সূর্য দীঘল বাড়ির মতো ঘেটুপুত্র কমলা আন্তর্জাতিক সম্মান বয়ে আনবে কি না? কিন্তু একথা ঠিক বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার যে পুরস্কার হুমায়ূন সব সময় পেয়ে এসেছেন তার এই চলচ্চিত্রটি যেনো কারো অবহেলায় তা না হারায়।
 
লেখক :  কাজী মামুন হায়দার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক।        
             


Powered By Dhaka Web Host

Jobsmag.inIndian Education BlogThingsGuide